Attractions

চাঁদপুর: ত্রিনদীর কোল জুড়ে ভাসমান ইলিশের শহর

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, চাঁদপুর শহরের ভূমি মোটেও নিরেট নয়। ভিতরটা ফাঁপা। তার প্রমাণ পাওয়া যায় কদিন পর পরই। তিন মোহনার বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা বড় স্টেশনের কিছু অংশ মাঝেমধ্যেই ডেবে যায় নিচের দিকে। নদীভাঙ্গন রোধে চারপাশে পাথরের ব্লক বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে তিন মোহনায়। তবুও শেষ রক্ষা হয় না। কদিন পর পরই ব্লকের মজবুত বেষ্টনী ভেদ করে নেমে যায় নিচের দিকে।

তিন নদীর মোহনা। স্থানীয়রা বড়স্টেশন নামেই চেনে। সোর্স: সজীব

১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস রেনেল তৎকালিন বাংলার যে মানচিত্র অংকন করেছিলেন তাতে চাঁদপুর নামে এক অখ্যাত জনপদ ছিল। তখন চাঁদপুরের দক্ষিণে নরসিংহপুর নামক (বর্তমানে যা নদী গর্ভে বিলীন) স্থানে চাঁদপুরের অফিস-আদালত ছিল। পদ্মা ও মেঘনার সঙ্গমস্থল ছিল বর্তমান স্থান থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে।

মেঘনা নদীর ভাঙাগড়ার খেলায় ওই এলাকা এখন বিলীন। বারো ভূঁইয়াদের আমলে চাঁদপুর অঞ্চল বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদরায়ের দখলে ছিল। ঐতিহাসিক জে.এম সেনগুপ্তের মতে চাঁদরায়ের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম চাঁদপুর। আবার কথিত আছে, চাঁদপুরের (কোড়ালিয়া) পুরিন্দপুর মহল্লার চাঁদ ফকিরের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম চাঁদপুর। কারো কারো মতে, শাহ আহমেদ চাঁদ নামে একজন প্রশাসক দিল্লী থেকে পঞ্চদশ শতকে এখানে এসে একটি নদী বন্দর স্থাপন করেছিলেন। তাঁর নামানুসারে এটি চাঁদপুর।

১৮৭৮ সালে প্রথম চাঁদপুর মহকুমার সৃষ্টি হয়। ১৮৯৬ সালের ১ অক্টোবর চাঁদপুর শহরকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী চাঁদপুর জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চাঁদপুর সদরে দেখার মতো, আড্ডা দেওয়ার মতো, কিংবা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে শরীর জুড়ানোর মতো একটা জায়গাই আছে। বড়স্টেশন নামে সবাই চেনে। জায়গাটা আসলে তিন মোহনা। পুরো শহর যখন অসম্ভব গরমে হাপিত্যেশ করে, তখন এই জায়গাটায় এলে নিমেষেই ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। কোনো কারণে প্রকৃতি গুমোট ধরে না থাকলে, এই মোহনায় স্নিগ্ধ হাওয়া থাকবেই।

রক্তধারা। এখানে বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য টুকটাক আয়োজন আছে। সোর্স: সজীব

এখানে “রক্ত ধারা” নামের সুন্দর একটি ভাস্কর্য আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ভাস্কর্যটি নির্মিত।

তিনটি নদীর সঙ্গমস্থল এই বড়স্টেশন। পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া। মজার ব্যাপার হলো, নৌকায় করে ঘুরতে বের হলে এই পানির রঙ একদম খালি চোখেও আলাদা করা যায়। পদ্মার পানি একটু কালচে ধরনের, মেঘনারটা ঘোলাটে সাদা আর ডাকাতিয়ার পানি একদম নির্মল।

প্রত্যেকটা নদী যে রয়েছে আলাদা রূপ নিয়ে ছুটে চলে, এখানে এলে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন।

নদী, নৌকো এবং সন্ধ্যাকাল। সোর্স: সজীব

গত বছর বড়স্টেশনকে জেলা ব্র‍্যান্ডিংয়ের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। তার আগেও এই জায়গা চাঁদপুরবাসীর কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল।

বড়স্টেশনের দুই পাশের ঘাটেই সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকে। নৌকা রিজার্ভ করে চলে যাওয়া যায় মেঘনার চরগুলোতে। মেঘনার চর এখন অনেকগুলো, কিন্তু যেগুলোতে মানুষের আনাগোনা আছে, কেবল সেগুলোতেই নৌকার মাঝিরা নিয়ে যায়। লোকে সাধারণত তিনটি চরে বেড়াতে যায়। এই তিনটি চরের নাম হলো- রাজ রাজেশ্বর, কাশফুলের চর আর বালুচর। কাশফুলের চরকে মেঘনার চরও ডাকে। তিনটি চর তিন রকমের সুন্দর।

পুরান বাজার থেকে মোহনা। সোর্স: সজীব

রাজ রাজেশ্বর চরটি গাঢ় সবুজে ঢাকা। পুরো চরের বুক জুড়ে জেগে উঠেছে ঘন সবুজ ঘাস। বেশ বড় এই চরের এপারে দাঁড়িয়ে ওপার দেখা যায় না। দিগন্তজোড়া সবুজ ঘাসের সীমারেখা ছাড়িয়ে ওপারে উঁকি দেয় নীলাভ আকাশ। এখানে গেলেই ইচ্ছে করে ঘাসের উপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। সতেজ ঘাস থাকায় এখানে গবাদিপশু চরতে দেওয়া হয়।

চরের আশেপাশে কোনো স্থল চোখে পড়বে না। থাকলেও তা অনেক দূর। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ট্রাভেলাররা এখানে অবশ্যই থ্রিল খুঁজে পাবেন। মনে হবে যেন গভীর সমুদ্রবেষ্টিত একটা দ্বীপে আপনি বন্দি! আমার মতে এই চরটিই সবচেয়ে সুন্দর।

চর রাজ-রাজেশ্বর। সোর্স: লেখিকা

কাশফুলের চরটা সবচেয়ে সুন্দর লাগে শরৎকালে। শুভ্র কাশফুলে ছেয়ে থাকে জায়গাটি। কাশফুল ছাড়াও এখানে আরোও কিছু বন্য বৃক্ষ জন্মে। কিছু লতানো গাছে জংলি ফুল ধরে। মাথা সমান উঁচু গোলপাতা গাছে ছেয়ে থাকে কিছু জায়গা। সেসব গাছ আলতো করে সরিয়ে ভিতরে ঢুকলে হয়তো দেখা যাবে অনেকটা খালি জায়গা। জঙ্গলের মাঝখানে কী করে খালি জায়গা থাকে, সেটাও এক রহস্য!

কাশফুলের চর কিংবা মেঘনার চরে আড্ডা হয় সময়ে অসময়ে। সোর্স: লেখিকা

বালুচরে কোনো গাছপালা কিচ্ছু নেই। যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ বালিয়াড়ি। কিন্তু এটি মোটেও মরুভূমির মতো নয়। এই বালুকাবেলা বেশ সরেশ। ভেতরটায় পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও একটু জোরে পা ফেললেই চুইয়ে চুইয়ে পানি বেরোয়। আর তীরে কিছুক্ষণ পর পর আছড়ে পড়ে ঢেউ। বড় বড় জাহাজ নদীর ওই অংশ দিয়ে পেরুনোর সময় ঢেউগুলো বেশ বড় হয়। চারিদিকে থৈ থৈ করা পানি আর আছড়ে পড়া ঢেউ দেখে মনে হবে আপনি কোনো সমুদ্র সৈকতে আছেন!

বালির চরের সূর্যাস্ত। সোর্স: সজীব

ঢাকাবাসীরা একদিনের ছুটি কাটাতে যে কেউ চলে আসতে পারেন চাঁদপুরে। সময়টা ভালোই কাটবে। রাজধানীবাসীদের জন্য আমি একটা ট্যুরপ্ল্যান দিয়ে দিচ্ছি।

ভোরবেলায়, পারলে ছয়টার আগেই চলে আসুন সদরঘাট। এসে সরাসরি চাঁদপুরের প্রথম লঞ্চে উঠে পড়ুন। প্রথম লঞ্চ ছাড়ে সকাল ৬টায়। কোনো কারণে ছয়টার লঞ্চ মিস হয়ে গেলে শঙ্কিত হবার কিছু নেই। সাতটা বিশে আরেকটা লঞ্চ আছে। কিছুক্ষণ পর পরই একটা করে লঞ্চ ছাড়ে। তিন- সাড়ে তিন ঘন্টায় চাঁদপুর চলে আসতে পারবেন।

চাঁদপুর লঞ্চঘাটে নেমে রিকশা অথবা অটোতে করে চলে যেতে পারেন বড় স্টেশনে। ভাড়া পড়বে রিকশায় ৩০ টাকা, অটোতে একজনের ১০ টাকা করে। কিংবা নদীর ধার ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করুন। ১৫ মিনিটের মাথায় বড়স্টেশন পৌঁছে যাবেন। সেই সাথে নদীর পাড়ের মানুষগুলোর জীবনযাপন দেখে নিতে পারবেন। এই হাঁটাপথে প্রকাণ্ড একটি বৃক্ষ আছে। দেখতে বেশ আকর্ষনীয়।

উত্তাল নদীতে নৌভ্রমণ। সোর্স: সজল

বড়স্টেশনে এসে কিছুক্ষণ বসতে পারেন নদীর ধারে। মোহনার বাতাসের ঝাপটা উপভোগ করতে পারেন। হাতে সময় কম থাকলে ইঞ্জিন নৌকা রিজার্ভ করে ফেলুন ঘাট থেকে। দুই ধরনের বোট পাওয়া যায়। ছই সহ, ছই ছাড়া। লোকসংখ্যা কম হলে ছই ছাড়া নিতে পারেন। ঘন্টাপ্রতি ৪০০ টাকা করে যায়। তবে নতুন মানুষ দেখলে দাম বেশি চাইতে পারে। দামাদামি করে নেবেন।

নিজেদের ইচ্ছেমতো সময়ে ঘুরে আসুন তিনটি চর। সাধারণত একবার নৌকা ভ্রমণে লোকে একটা চরে গিয়েই সময় কাটায়। নৌকাওয়ালাদের বলে নিতে ভুলবেন না যে আপনারা তিনটি চরেই যাবেন।

নদীভাঙ্গন রোধের জন্য মোহনা ফেলা আছে অসংখ্য ব্লক। সোর্স: মেহজাবিন

আবার যদি মনে করেন, চরে ঘুরবেন না, এমনিতেই নৌকায় ঘুরে বেড়াবেন, সেক্ষেত্রে বৈঠাওয়ালা নৌকা রিজার্ভ করুন। ঘন্টাপ্রতি ২০০ টাকার বেশি নেবে না। দামাদামি করতে পারলে আরোও কমে যেতে পারবেন।

নৌকাভ্রমণ হয়ে গেলে ফিরে আসুন মোহনা পাড়ে। লোকসংখ্যা কম হলে কাছাকাছি ভাতের হোটেলে গিয়ে মাছ-ভাত খেয়ে নিতে পারেন। ইলিশ মাছ ভাজা, নদীর ছোট মাছের তরকারি আলুভর্তা আর ডাল। তৃপ্তি পাবেন খেয়ে। এক পিস ইলিশ মাছের দাম পড়বে ৬০-৮০ টাকা।

সদস্য সংখ্যা বেশি হলে মোহনা থেকে বের হয়ে রেল স্টেশনের দিকে যান। এই রেলওয়ে স্টেশনের কারণেই এর নাম বড় স্টেশন। পূর্বদিকে ৩-৪ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন। স্টেশনের উলটো পাশে মাছের আড়ৎ পাবেন। হৈহুল্লোড় করে ইলিশ মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। সদস্য সংখ্যানুযায়ী ইলিশ মাছ কিনে ফেলুন। মাঝারি সাইজের একটা ইলিশের দাম পড়বে ৪০০ টাকা। মৌসুমে আরও কমে পাবেন।

মাছ নিয়ে একটু ভেতরের দিকে গেলে কতগুলো ভাতের হোটেল চোখে পড়বে। পছন্দ মতো একটায় ঢুকে গিয়ে মাছটা ভেজে দিতে বলুন। মাছের সাইজের উপর ডিপেন্ড করে ৮০-১৫০ টাকা পর্যন্ত নেবে। আধা ঘন্টার মধ্যে আপনাকে মাছ রেডি করে সামনে দেবে। ধোয়া ওঠা গরম ভাত, আলুভর্তা আর ডাল দিয়ে যখন কবজি ডুবিয়ে খেতে থাকবেন, মনে হবে সত্যি, বাঙালি হওয়া সার্থক। সাথে যদি অন্য কোনো মাছের তরকারী থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

খানাপিনা। সোর্স: মেহজাবিন

তারপর রিকশা বা অটোয় করে কালীবাড়ি গিয়ে চাঁদপুরের বিখ্যাত ওয়ান মিনিটের আইসক্রিম খেয়ে আসতে পারেন। দাম ৪০ টাকা। তারপর শহরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে পারেন। কালীবাড়ি থেকে একটু সামনে এগিয়ে লেকের পাড় গেলেই চাঁদপুরের বহু পুরোনো ভাস্কর্য “অঙ্গীকার” দেখে আসতে পারেন।

দিনের আলোয় চাঁদপুর থেকে শেষ লঞ্চটি ছেড়ে যায় ৫টায়। এর পর রাতেও ছাড়ে, কিন্তু সেটা রাত ৯টার পর। পাঁচটার লঞ্চ ধরে ঢাকায় ফিরে আসাই নিরাপদ।

ওয়ানমিনিটের আইস্ক্রিম। সোর্স: মেহজাবিন

কীভাবে যাবেন:

চাঁদপুর গেলে লঞ্চের বিকল্প নেই। সোনার তরী, রফরফ, আল বোরাক, ঈগল, বোগদাদীয়া কিংবা ময়ূরে আসতে পারবেন। সবগুলো লঞ্চের ভাড়া মোটামুটি একরকমই।

কোয়ালিটির উপর নির্ভর করে লঞ্চ ভাড়া ১০০-৮০০ টাকার মধ্যে। অনেক বন্ধুবান্ধব একসাথে থাকলে ১০০ টাকা করে ডেকের টিকিট কেটে নিতে পারেন। এতে টাকাও বাঁচবে আর রেলিংয়ের ধারে ভর দিয়ে কিংবা লঞ্চের ছাদে বসে উপভোগ করতে পারবেন দুই পাশের নদী তীরের অসাধারণ দৃশ্য। অথবা ১৫০ টাকা দিয়ে চেয়ার কোচে নিয়ে বসে যেতে পারবেন।

লঞ্চের ক্যান্টিনের খাবার এড়িয়ে যাওয়া উত্তম, কারণ তারা অতিরিক্ত দাম রাখে। বাইরে থেকে নিয়ে নিতে পারেন টুকটাক স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার।

লেখিকা পরিচিতিঃ

আমি মৌ। ভাল নাম মাদিহা ইসলাম মৌ। ছোটবেলা থেকেই পড়তে ভীষণ ভালোবাসি। সুযোগ পেলেই ঘোরাঘুরি করার জন্য ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলায় ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে আছে। তারপর এশিয়ার সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলো। লেখালেখির সাথেই আছি গত কয়েকবছর ধরে। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনে বিভিন্ন পত্রিকায়, গল্প সংকলনে লিখেছি। ২০১৭ তে রোদেলা থেকে ‘এক্সক্যাভেশন’, ভূমি থেকে ‘দ্য ফোর লিজেন্ডারি কিংডমস’ এবং ২০১৮ তে ‘দ্য ডটার অব টাইম’ অনুবাদ গ্রন্থগুলো বের হয়েছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি মৌলিক নিয়েও কাজ করছি। আর পড়াশোনা? পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্সে পড়ছি। আর পাশাপাশি একটি বেসরকারি স্কুলে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি।

Leave a Reply

Lost Password

Sign Up

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
x Shield Logo
This Site Is Protected By
The Shield →